অনেক বছর আগে, যখন আকবর ভারতের সম্রাট ছিলেন, তখন তাঁর রাজধানী ছিল দিল্লিতে। আকবর ছিলেন খুবই বুদ্ধিমান শাসক। তিনি নিজে খুব বেশি লেখাপড়া না জানলেও জ্ঞানী ও প্রতিভাবান মানুষদের খুব সম্মান করতেন।
তাঁর দরবারে অনেক বিখ্যাত মানুষ ছিলেন। কেউ ছিলেন গায়ক, কেউ কবি, কেউ রাজনীতিবিদ, আবার কেউ ছিলেন হাস্যরসিক। এদের মধ্যে সবচেয়ে মজার ও বুদ্ধিমান ছিলেন বীরবল।
বীরবল সাধারণ পরিবারের মানুষ ছিলেন, কিন্তু তাঁর বুদ্ধি আর গল্প বলার ক্ষমতা ছিল অসাধারণ। তিনি এমন মজার গল্প বলতেন যে সবাই হেসে কুটিকুটি হয়ে যেত।
একদিন বীরবলের গল্প শুনে সম্রাট আকবর এত হাসলেন যে চোখে পানি এসে গেল। তিনি বললেন,
— বীরবল, আজ তুমি আমাকে এত হাসিয়েছ যে আমি খুব খুশি হয়েছি। বলো, কী পুরস্কার চাও? যা চাইবে, তাই দেব।
বীরবল উঠে সম্মান জানিয়ে বললেন,
— জাহাপনা, যদি সত্যিই খুশি হয়ে থাকেন, তাহলে আমাকে একশো চাবুক মারার আদেশ দিন।
কথাটা শুনে পুরো দরবার স্তব্ধ হয়ে গেল।
আকবর অবাক হয়ে বললেন,
— কী বলছ! কেউ কখনও পুরস্কার হিসেবে চাবুক চায় নাকি?
বীরবল শান্তভাবে বললেন,
— আমি মজা করছি না, জাহাপনা। যদি পুরস্কার দিতেই চান, তাহলে এটাই দিন।
অনেক বুঝিয়েও লাভ হলো না। শেষ পর্যন্ত আকবর বাধ্য হয়ে জল্লাদকে আদেশ দিলেন।
জল্লাদ চাবুক মারতে শুরু করল।
এক… দুই… তিন…
পঞ্চাশটি চাবুক মারার পর বীরবল হঠাৎ হাত তুলে বললেন,
— থামুন! আর নয়।
আকবর স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বললেন,
— অবশেষে বুঝি তোমার বুদ্ধি ফিরেছে!
কিন্তু বীরবল বললেন,
— না জাহাপনা। আমি তো আমার পুরস্কারের অর্ধেক পেয়েছি। বাকি অর্ধেক আমার এক বন্ধুকে দিতে হবে। আমি তাকে কথা দিয়েছি।
দরবারে আবার ফিসফাস শুরু হয়ে গেল।
আকবর বললেন,
— তোমার সেই বন্ধুকে নিয়ে আসো।
বীরবল বাইরে গিয়ে রাজপ্রাসাদের এক দারোয়ানকে নিয়ে এলেন।
দারোয়ানকে দেখে সবাই অবাক।
বীরবল বললেন,
— জাহাপনা, এই হলো আমার সেই বন্ধু। আমার পুরস্কারের অর্ধেক তার প্রাপ্য।
আকবর কিছুই বুঝতে পারলেন না। তখন বীরবল সব খুলে বললেন।
— অনেক দূরের এক গ্রাম থেকে আমি একদিন দিল্লিতে এসেছিলাম। আপনার সঙ্গে দেখা করার খুব ইচ্ছা ছিল। কিন্তু প্রাসাদের ফটকে এই দারোয়ান আমাকে আটকে দেয়। সে বলে, তাকে বখশিশ না দিলে আমাকে ভেতরে ঢুকতে দেবে না।
— আমার কাছে কোনো টাকা ছিল না। তখন আমি বললাম, “সম্রাট যদি আমাকে কোনো পুরস্কার দেন, তার অর্ধেক তোমাকে দেব।” তখন সে রাজি হয়ে আমাকে ভেতরে ঢুকতে দেয়।
— আজ আমি আপনার কাছ থেকে একশো চাবুকের পুরস্কার পেয়েছি। তার পঞ্চাশটি আমি নিয়েছি। এখন বাকি পঞ্চাশটি এই দারোয়ানের পাওনা।
কথাটা শুনে পুরো দরবার হেসে উঠল।
এরপর আরও কয়েকজন এগিয়ে এসে অভিযোগ করল যে ওই দারোয়ান সবার কাছ থেকেই ঘুষ নিয়ে দরবারে ঢুকতে দিত।
সব শুনে আকবর খুব রেগে গেলেন।
তিনি আদেশ দিলেন,
— এই অসৎ দারোয়ানকে পঞ্চাশ চাবুক মারো এবং রাজ্য থেকে বের করে দাও!
দারোয়ান তখন নিজের ভুলের শাস্তি পেল।
আকবর বীরবলের বুদ্ধিতে খুব খুশি হলেন। তিনি বললেন,
— বীরবল, তুমি শুধু মজার মানুষ নও, তুমি অন্যায় ধরারও ওস্তাদ।
এরপর তিনি বীরবলকে অনেক স্বর্ণমুদ্রা পুরস্কার দিলেন এবং দরবারে তাঁর সম্মান আরও বাড়িয়ে দিলেন।
শিক্ষা: বুদ্ধি ও সততার সাহায্যে বড় অন্যায়ও ধরা যায়। লোভের শেষ ফল সবসময়ই খারাপ।


