অনেককাল আগের কথা। এক গাঁয়ে ছিল এক ছেলে—তার নাম জ্যাক। এক ভোরবেলা, কুয়াশা তখনো মাঠের বুক ছেড়ে পুরোপুরি উড়ে যায়নি, জ্যাক কাঁধে ছোট্ট পুঁটলি নিয়ে বেরিয়ে পড়ল ভাগ্য খুঁজতে।
হাঁটতে হাঁটতে সে গুনগুন করে গান গায়, আর পথ যেন দুলতে দুলতে এগোয়—
ঝিগেলটি-ঝোল্ট! ঝিগেলটি-ঝোল্ট! ঝিগেলটি-ঝোল্ট!
একটু যেতেই রাস্তার ধারে এক মোটা টুনটুনে বিড়ালের সঙ্গে দেখা।
বিড়াল গোঁফ নেড়ে বলল,
—কোথায় যাও হে জ্যাক?
জ্যাক বুক ফুলিয়ে বলল,
—ভাগ্য খুঁজতে যাচ্ছি।
—আমাকেও নেবে সঙ্গে?
—চলো না! যত বেশি, তত মজা।
তাই দু’জনে চলল পথে।
জ্যাক আর বিড়াল।
ঝিগেলটি-ঝোল্ট! ঝিগেলটি-ঝোল্ট! ঝিগেলটি-ঝোল্ট!
আরো খানিক দূরে গিয়ে দেখা হল এক কুকুরের সঙ্গে। তার কান দুটো ঝুলে আছে, আর লেজ নাড়তে নাড়তে সে বলল,
—কোথায় যাও জ্যাক ভাই?
—ভাগ্য খুঁজতে।
—আমিও যাই?
—এসো এসো! দল বড় হলে সাহসও বড় হয়।
তাই এবার চলল তিনজন—
জ্যাক, বিড়াল আর কুকুর।
ঝিগেলটি-ঝোল্ট! ঝিগেলটি-ঝোল্ট! ঝিগেলটি-ঝোল্ট!
আরো একটু যেতেই দেখা এক ছাগলের সঙ্গে। ছাগল দাঁড়ি দুলিয়ে বলল,
—কোথায় যাও তোমরা?
—ভাগ্য খুঁজতে।
—আমাকেও নাও না!
—চলো চলো!
তাই এবার চলল চারজনে—
জ্যাক, বিড়াল, কুকুর আর ছাগল।
ঝিগেলটি-ঝোল্ট! ঝিগেলটি-ঝোল্ট! ঝিগেলটি-ঝোল্ট!
তারপর দেখা হল এক বিশাল ষাঁড়ের সঙ্গে। সে ফুঁসফুঁস করে বলল,
—কোথায় যাও হে?
—ভাগ্য খুঁজতে।
—আমিও যাব।
—তবে চলো!
এবার দল হলো আরো ভারী—
জ্যাক, বিড়াল, কুকুর, ছাগল আর ষাঁড়।
ঝিগেলটি-ঝোল্ট! ঝিগেলটি-ঝোল্ট! ঝিগেলটি-ঝোল্ট!
শেষে এক লাল ঝুঁটির মোরগ এসে ডানা ঝাপটে বলল,
—কো-কো-কো! কোথায় যাও সবাই?
—ভাগ্য খুঁজতে।
—আমাকেও নাও!
—এসো ভাই, এসো!
তাই এবার ছয়জনে চলল পথে—
জ্যাক, বিড়াল, কুকুর, ছাগল, ষাঁড় আর মোরগ।
ঝিগেলটি-ঝোল্ট! ঝিগেলটি-ঝোল্ট! ঝিগেলটি-ঝোল্ট!
এভাবে চলতে চলতে সন্ধ্যা নেমে এল। আকাশে বাদুড় উড়ে বেড়ায়, দূরে শেয়ালের ডাক শোনা যায়। তখন সবার চিন্তা—রাতটা কাটাবে কোথায়?
ঠিক সেই সময় দূরে একটা বাড়ি দেখা গেল। জানালায় ক্ষীণ আলো জ্বলছে।
জ্যাক বলল,
—তোমরা চুপ করে থাকো। আমি আগে দেখে আসি ভেতরে কী আছে।
সে পা টিপে টিপে জানালার কাছে গিয়ে উঁকি দিল।
আর উঁকি দিয়েই তার চোখ কপালে!
ঘরের ভেতর কয়েকজন ডাকাত বসে আছে। টেবিলের উপর সোনার মোহরের থলে। তারা বসে বসে সোনা গুনছে।
ঝনঝন! ঝমঝম!
জ্যাক মনে মনে বলল,
—আহা! আমার ভাগ্য তো এখানেই!
সে দৌড়ে ফিরে এসে সবার কানে কানে বলল,
—আমি যখন ইশারা দেব, তখন সবাই নিজের গলায় যত জোর আছে তত জোরে চিৎকার করবে।
সবাই রাজি।
তারপর জ্যাক ফিসফিস করে বলল,
—এবার!
অমনি—
বিড়াল বলল, “ম্যাঁওওও!”
কুকুর বলল, “ঘেউউউ!”
ছাগল বলল, “ম্যাঁ-এ-এ!”
ষাঁড় গর্জে উঠল, “হাম্বা-আ-আ!”
মোরগ চেঁচিয়ে উঠল, “কুঁকড়ু-কুঁউউ!”
সব মিলিয়ে এমন ভয়ানক হইচই উঠল যে ডাকাতরা ভয়ে থরথর কাঁপতে লাগল।
—ভূত! ভূত!
বলে তারা সোনা-দানা ফেলে প্রাণপণে পালাল।
ডাকাতরা পালাতেই জ্যাক আর তার সঙ্গীরা হো হো করে হেসে ঘরে ঢুকল। তারপর আরাম করে বসে পড়ল সোনার থলের পাশে।
কিন্তু জ্যাক ছিল বুদ্ধিমান ছেলে। সে ভাবল, “ডাকাতগুলো নিশ্চয়ই রাতে আবার ফিরে আসবে।”
তাই সে সবাইকে জায়গামতো বসিয়ে দিল।
বিড়ালকে বসাল দোলনা-চেয়ারে।
কুকুরকে টেবিলের নিচে।
ছাগলকে সিঁড়ির মাথায়।
ষাঁড়কে পাঠাল নিচের গুদামঘরে।
আর মোরগকে উঠিয়ে দিল ছাদের চিমনির পাশে।
তারপর সবাই ঘুমোতে গেল।
মাঝরাতে সত্যিই এক ডাকাত চুপিচুপি ফিরে এল সোনা নিতে।
সে ভয়ে ভয়ে ঘরে ঢুকল।
প্রথমে দোলনা-চেয়ারে বসতে যাবে—অমনি বিড়াল তার মুখে ঝাঁপিয়ে পড়ে নখ বসিয়ে দিল!
ডাকাত চেঁচিয়ে উঠল,
—ও মা! বুড়ি মহিলা সুচ দিয়ে খোঁচা মারছে!
তারপর সে টেবিলের কাছে গেল। অমনি নিচে থেকে কুকুর কামড় বসাল পায়ে।
—ওরে বাবা! এক মুচি শলা দিয়ে ফুটো করে দিল!
ভয়ে সে দৌড়ে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে গেল। ছাগল তখন ধাক্কা মেরে তাকে গড়াগড়ি খাইয়ে দিল।
—হায় রে! কেউ লাঠি দিয়ে পেটাচ্ছে!
তারপর সে নিচের গুদামঘরে নামল। অমনি ষাঁড় তাকে এমন গুঁতো দিল যে সে উলটে পড়ল।
—বাঁচাও! কাঠুরে কুঠার মারছে!
এতেও শেষ নয়।
ছাদের ওপর থেকে মোরগ তখন গলা ফাটিয়ে ডাকছে—
—কুঁকড়ু-কুঁ! ঝোলে দাও! ঝোলে দাও! ঝোলে দাও!
ডাকাত তো ভয়ে অজ্ঞান হবার জোগাড়!
সে দৌড়ে গিয়ে সঙ্গীদের বলল,
—না ভাই! ওই বাড়িতে দানব থাকে! সোনা লাগবে না, প্রাণটা থাকলেই বাঁচি!
তারপর সব ডাকাত রাতের অন্ধকারে এমন পালাল যে আর কোনোদিন ফিরে এল না।
পরদিন সকালে জ্যাক আর তার সঙ্গীরা আনন্দে নাচতে নাচতে বাড়ির পথে রওনা দিল।
সবাই সোনার ভাগ পেল।
বিড়াল তার লেজে ঝুলিয়ে নিল এক থলে।
কুকুর গলায় বাঁধল আরেক থলে।
ছাগল আর ষাঁড় শিংয়ে ঝুলিয়ে নিল সোনা।
আর মোরগের ঠোঁটে জ্যাক গুঁজে দিল এক সোনার মোহর—যেন সে বেশি ডাকাডাকি না করে।
তবু সে হাঁটতে হাঁটতে গাইতেই লাগল—
—কুঁকড়ু-কুঁ!
ঝোলে দাও! ঝোলে দাও!
কুঁকড়ু-কুঁ!
ঝোলে দাও! ঝোলে দাও!


