গরমের দুপুর যেন আগুন ঢেলে দিয়েছে মাঠের ওপর। ধুলোভরা সরু পথ দিয়ে এক সারি পিঁপড়া টুপটাপ হেঁটে চলেছে। প্রত্যেকের মুখে গমের দানা—নিজেদের শরীরের চেয়েও বড়। কেউ থামে না, কেউ হাঁফ ছাড়ে না। মাঠ থেকে খাবার কুড়িয়ে তারা নিয়ে যাচ্ছে মাটির নিচের ঘরে।
যাও আর আসো।
আসো আর যাও।
টুপটাপ! টুপটাপ! টুপটাপ!
পাশের এক লম্বা ঘাসের ডগায় বসেছিল এক ফড়িং। সে নিজের পা ঘষে টুংটাং সুর তুলছে। রোদে তার ডানা চকচক করছে।
পিঁপড়েদের দেখে সে হেসে বলল,
—আরে ভাই, এত খাটাখাটনি কিসের? দেখো না, কী সুন্দর রোদ! মাঠভরা ফুল! এসো না, গান গাই!
সামনের বুড়ো পিঁপড়েটি থামল। মাথা তুলে শান্ত গলায় বলল,
—আমরা শীতের জন্য খাবার জমাচ্ছি। বরফ পড়লে তখন কিছুই পাওয়া যাবে না। তুমিও কিছু জোগাড় করো।
ফড়িং হো হো করে হেসে উঠল।
—শীত? সে তো অনেক দেরি! পরে ভাবা যাবে। এখন গান গাওয়ার সময়।
বলে সে আবার সুর ধরল—
টিংটিং টুংটাং!
ঝিরিঝিরি ঝংকার!
দিন কেটে গেল।
আকাশের রং বদলাতে লাগল। গাছের পাতা সবুজ ছেড়ে হলুদ, লাল, সোনালি হয়ে উঠল। বাতাসে হালকা শীতের গন্ধ।
তবু পিঁপড়েরা কাজ করেই চলল। তারা দানা কুড়িয়ে মাটির নিচে জমায়, শুকনো ঘাস এনে দেয়ালে গুঁজে রাখে, যাতে ঠান্ডা ঢুকতে না পারে।
আর ফড়িং?
সে এক মাঠ থেকে আরেক মাঠে উড়ে বেড়ায়। গান গায়। নাচে। গল্প করে।
কিন্তু ধীরে ধীরে ফুল শুকিয়ে গেল। মাঠ ফাঁকা হতে লাগল। তার গান শোনার লোকও কমে এল।
একদিন এক ছোট্ট পিঁপড়ে পথ চলতে চলতে বলল,
—ফড়িং ভাই, ঠান্ডা আসছে। বাতাসেই তার গন্ধ। তুমি কি খাবার জমিয়েছ?
ফড়িং হেসে বলল,
—এখনো না। তবে করব। খুব শিগগিরই করব।
ছোট্ট পিঁপড়েটি মাথা নেড়ে চলে গেল।
তারপর একদিন হঠাৎ শীত নেমে এল।
যেমন আচমকা ঝড় আসে, তেমনি।
মাঠ সাদা বরফে ঢেকে গেল। ঝরনার জল জমে পাথর হয়ে গেল। ফুল নেই, ঘাস নেই—সব বরফের নিচে চাপা।
ফড়িং ঠান্ডায় কাঁপতে কাঁপতে ঘুরে বেড়ায়। তার পেট খালি। পা জমে আসছে।
সে পাথরের নিচে খোঁজে। শুকনো পাতার তলায় খোঁজে।
কিছুই নেই।
হিমেল বাতাস ছুরি হয়ে গায়ে লাগে। আশ্রয়ও নেই কোথাও।
শেষে কাঁপতে কাঁপতে সে এসে দাঁড়াল পিঁপড়েদের ঘরের সামনে। দুর্বল হাতে দরজায় টোকা দিল।
টক… টক…
দরজা খুলে দিল সেই বুড়ো পিঁপড়ে।
সে চুপচাপ ফড়িংয়ের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর আস্তে বলল,
—গরমের দিনে আমরা যখন কাজ করছিলাম, তুমি তখন কী করছিলে?
ফড়িং মাথা নিচু করল।
—আমি গান গেয়েছি… খেলেছি… ভেবেছিলাম, সময় তো আছেই।
বুড়ো পিঁপড়ে ধীরে মাথা নাড়ল।
তারপর সরে দাঁড়িয়ে বলল,
—ভেতরে এসো।
ফড়িং ভেতরে ঢুকে অবাক হয়ে গেল।
মাটির নিচের সেই ঘর উষ্ণ আর আলোয় ভরা। মাঝখানে ছোট্ট আগুন জ্বলছে।
চারদিকে পিঁপড়েরা হাসছে, গল্প করছে, গান গাইছে।
ছোট পিঁপড়েরা দৌড়াদৌড়ি করছে সুড়ঙ্গ জুড়ে। বুড়োরা বসে খাবার ভাগ করছে।
সারা গরমকাল তারা এত পরিশ্রম করেছে বলেই এখন শীতের রাতে নিশ্চিন্তে আনন্দ করতে পারছে।
বুড়ো পিঁপড়ে তাকে এক টুকরো শস্য দিল।
—খাও।
ফড়িং কাঁপা হাতে সেটা নিল।
বুড়ো পিঁপড়ে বলল,
—মনে রেখো, কাজেরও সময় আছে, খেলাধুলারও সময় আছে। কিন্তু কাজের সময় যদি শুধু খেলাই করো, তবে শেষে না থাকবে খাবার, না থাকবে আনন্দ।
ফড়িং চুপ করে আগুনের দিকে তাকিয়ে রইল। বাইরে তখন বরফ ঝরছে নিঃশব্দে।


