আলাদিনের জাদুর প্রদীপ

এক যে ছিল বিধবা মা, আর তার একরোখা ছেলে—নাম তার আলাদিন। নুন আনতে পান্তা ফুরায় এমন দশা, কিন্তু আলাদিন ছিল বড্ড চনমনে। সে দূরে দূরে বনে-বাদাড়ে ঘুরে কলা পেড়ে দু-পয়সা যা পেত, তা দিয়েই কোনোমতে মা-ব্যাটার দিন কেটে যেত।

একদিন শহরের বাইরে ডুমুর খুঁজছে আলাদিন, এমন সময় এক আজব মানুষের সাথে তার দেখা। বেশ জাঁকালো সাজপোশাক, চোখে ধারালো চাউনি, আর থুতনিতে একদম ছাঁটা কালো দাড়ি। লোকটার মাথার পাগড়িতে একটা ঝকঝকে নীল মণি জ্বলজ্বল করছে। সে আলাদিনকে কাছে ডেকে অদ্ভুত এক সওয়াল করল।

“এই ছোকরা, এদিকে আয় তো। একটা রুপোর মোহর কামাতে চাস?”

আলাদিন তো আকাশ থেকে পড়ল! “রুপোর মোহর! হুজুর, ওটার জন্য আমি জান লড়িয়ে দিতে পারি।”

লোকটা মুচকি হেসে বলল, “আরে না, অতটা লাগবে না। শুধু এই গর্তটা দিয়ে একটু নিচে নামতে হবে। আমার গতরটা বড্ড বড়, ও চিপা দিয়ে গলবে না। তুই যদি কাজটা ঠিকঠাক করিস, তবে ইনাম পেয়ে যাবি।”

ভারী একটা পাথরের ঢাকনা দুজনে মিলে সরাতেই সুড়ঙ্গ বেরিয়ে এল। আলাদিন তো এমনিতেই চটপটে, সেড়সেড় করে নিচে নেমে গেল। সিড়ি বেয়ে নিচে নামতেই তার চক্ষু চড়কগাছ! সামনে একটা প্রকাণ্ড ঘর। একটা পুরনো তেলের প্রদীপের টিমটিমে আলোয় চারপাশটা যেন হিরের কুচির মতো ঝিকমিক করছে। চোখ সইয়ে আসতেই সে দেখল—গাছে গাছে ফল নয়, ঝুলছে দামী জহরত; মাটির কলস ভরা সোনার মোহর। এ যে রীতিমতো যকের ধন!

আলাদিন যখন হাঁ করে তাকিয়ে আছে, তখনই উপর থেকে লোকটার হাঁক শোনা গেল— “ঐ প্রদীপটা! ওটার আগুন নিভিয়ে ওটা নিয়ে জলদি উপরে আয়!”

আলাদিনের মনে খটকা লাগল। এত ধনরত্ন থাকতে লোকটা ঐ পুরনো ল্যাম্পটার জন্য এমন করছে কেন? নির্ঘাত কোনো জাদুকর হবে! সে সাবধান হয়ে প্রদীপটা নিয়ে উপরে উঠে এল।

জাদুকর অস্থির হয়ে চেল্লাতে লাগল, “দে ওটা আমাকে! জলদি হাত বাড়িয়ে দে!” আলাদিন পিছু হটে বলল, “আগে আমাকে বেরোতে দিন, তবেই দেব।”

রাগে গরগর করতে করতে জাদুকর বলল, “তবে মর তুই ওখানেই!” বলেই সে ধড়াস করে ঢাকনাটা বন্ধ করে দিল। কিন্তু তাড়াহুড়োয় তার আঙুল থেকে একটা আংটি খুলে নিচে পড়ে গেল, সে টেরও পেল না।

ঘুটঘুটে অন্ধকারে আলাদিন তো ভয়ে সিঁটিয়ে আছে। হঠাৎ তার পায়ে কী যেন একটা ঠেকল। কুড়িয়ে নিয়ে সে আংটিটা আঙুলে পরে আনমনে ঘষতে শুরু করল। ব্যস! অমনি ঘরটা গোলাপি আলোয় ভরে উঠল আর মেঘের ওপর দাঁড়িয়ে প্রকাণ্ড এক জিন হাত জোড় করে হাজির!

সে গম্ভীর গলায় বলল, “হুকুম করুন জাঁহাপনা!” আলাদিন আমতা আমতা করে বলল, “আমি… আমি বাড়ি যেতে চাই!” নিমেষের মধ্যে সে নিজের ঘরে। মা তো অবাক! “আরে, তুই এলি কোত্থেকে? আর রুপোর মোহর কোথায়?”

আলাদিন কপালে হাত দিয়ে বলল, “সবই কপাল মা! মোহরের বদলে শুধু এই পুরনো প্রদীপটা আনতে পেরেছি।” মা বললেন, “দে দেখি, বড্ড ময়লা হয়ে আছে, একটু ঘষে পরিষ্কার করি।”

যেই না ঘষা, অমনি ধোঁয়ার কুণ্ডলী পাকিয়ে আরেক বিশাল জিন উদয় হলো! সে কুর্নিশ করে বলল, “শয়ে শয়ে বছর পর আজ আমায় মুক্তি দিলেন। আমি এই প্রদীপের গোলাম। কী হুকুম আপনার?”

আলাদিন আর তার মা তো থ! অবাক চোখে তাকিয়ে রইলেন। জিন একটু তিতিবিরক্ত হয়ে বলল, “খিদে পেয়েছে? খাবার দেব?” মা থতমত খেয়ে বললেন, “হ্যাঁ বাবা, ভালো দেখে কিছু খাবার দাবার দাও তো।”

সেই দিন থেকে তাদের অভাব ঘুচল। প্রদীপের জিনের কল্যাণে দামী পোশাক, রাজকীয় বাড়ি আর ভালো মন্দ খাবার—আলাদিনদের এখন কোনো কিছুরই কমতি নেই। আলাদিন এখন এক ডাগর সুপুরুষ জোয়ান।

একদিন বাজারে সে সুলতানের মেয়ে হালিমাকে পালকি করে যেতে দেখল। ক্ষণিকের দেখা, কিন্তু রাজকুমারীর মায়াবী রূপ দেখে আলাদিন তার প্রেমে হাবুডুবু খেতে লাগল। মা শুনে বললেন, “চিন্তা করিস না, আমি কালই সুলতানের কাছে তোর জন্য হালিমাকে চাইতে যাব। দেখিস, তিনি না করতে পারবেন না।”

এক বাক্স হিরে-জহরত দেখে সুলতান তো গদগদ। কিন্তু উজিরের মনে ভারী হিংসে। সে ফিসফিস করে সুলতানকে কুবুদ্ধি দিল। সুলতান বললেন, “বিয়ে হতে পারে, তবে আলাদিনকে প্রমাণ দিতে হবে তার ক্ষমতা কত। কালকের মধ্যে চল্লিশজন গোলাম পাঠাতে হবে, যাদের প্রত্যেকের হাতে থাকবে রত্নখচিত বাক্স। আর সাথে থাকবে চল্লিশজন আরব সৈন্য।”

আলাদিনের মা তো ভয়ে সারা। কিন্তু আলাদিন হাসিমুখে প্রদীপ ঘষল। পরদিন সকালে সুলতান দেখলেন—প্রাসাদের সামনে কাতার দিয়ে রাজকীয় ধনদৌলত আর সৈন্য দাঁড়িয়ে। সুলতান আর না করতে পারলেন না। তবে উজির আবার খোঁচা দিল, “থাকবে কোথায়?” সুলতান বললেন, “হালিমার জন্য একটা ঝকঝকে নতুন প্রাসাদ বানিয়ে দাও আগে।”

এক রাতেই মরুভূমির বুকে জিনের জাদুতে খাড়া হয়ে গেল এক অপার্থিব সুন্দর প্রাসাদ। মহাসমারোহে আলাদিন আর হালিমার বিয়ে হলো।

কিন্তু সুখের কপালে তো সবসময় শনি লেগে থাকে। সেই জাদুকর সব খবর পেয়ে এক ছদ্মবেশী ফেরিওয়ালার বেশে এল প্রাসাদের নিচে। সে চিৎকার করতে লাগল, “পুরনো প্রদীপ দিলে নতুন প্রদীপ দেব! বদলে নিন!”

হালিমা এই প্রদীপের গোপন কথা জানত না। সে ভাবল আলাদিনকে চমকে দেবে। পুরনো মরচে ধরা প্রদীপটা দিয়ে সে একটা ঝকঝকে নতুন প্রদীপ নিয়ে নিল। ব্যস! জাদুকর প্রদীপ পেয়েই জিনকে হুকুম দিল—নিমেষের মধ্যে প্রাসাদ আর রাজকুমারীকে উড়িয়ে নিয়ে গেল এক অচেনা মুলুকে।

আলাদিন তো দিশেহারা! তখনই তার মনে পড়ল সেই জাদুকরের আংটির কথা। সে আংটি ঘষে জিনকে বলল, “আমায় আমার স্ত্রীর কাছে নিয়ে চলো।” চোখের পলকে সে নিজের প্রাসাদে পৌঁছাল আর দেখল জাদুকর সেখানে হালিমাকে দিয়ে দাসীর কাজ করাচ্ছে।

আলাদিন ফিসফিস করে হালিমাকে বলল, “এই গুঁড়োটা ওর চায়ের সাথে মিশিয়ে দাও।” জাদুকর সেই চা খেয়েই অঘোরে ঘুমিয়ে পড়ল। আলাদিন অনেক খুঁজেও প্রদীপ পাচ্ছিল না, শেষে জাদুকরের বালিশের নিচে সেটা খুঁজে পেল। ঘষা দিতেই জিনের হাসিভরা মুখ—”আবার দেখা হলো মনিব!”

আলাদিন বলল, “এই শয়তান জাদুকরকে বেঁধে এমন জায়গায় রেখে এসো যেখান থেকে সে আর ফিরতে না পারে।” জিন এক নিমিষে জাদুকরকে হাপিস করে দিল। হালিমা ভয়ে আলাদিনকে জড়িয়ে ধরল। আলাদিন তাকে সব কথা খুলে বলল।

প্রাসাদ ফিরে এল আগের জায়গায়। সুলতান তো মেয়ের চিন্তায় আধমরা হয়ে ছিলেন, তাদের দেখে ধড়ে প্রাণ ফিরে পেলেন। আর সেই হিংকুটে উজিরের মুখটা চুনকালি মাখানো হয়ে গেল।

কথিত আছে, আজও সেই সুদূর দেশে সেই আজব প্রাসাদের ধ্বংসাবশেষ দেখা যায়, লোকে যাকে বলে ‘আকাশ থেকে আসা প্রাসাদ’। আলাদিন আর হালিমা সুখে-শান্তিতে বহুদিন রাজত্ব করেছিল।

Tags

What do you think?